দেহঘড়ির কলকব্জা

বিজ্ঞান পড়তে এসে কত কী-ই না দেখা, জানা হলো আমাদের, তাই না? দেয়ালের গায়ে ছোট্ট পিঁপড়া থেকে মহাবিশ্বের গ্যালাক্সি- কত কিছু নিয়েই না মাথা ঘামালে গত ক’মাসে! কিন্তু এতকিছুর ভিড়ে নিজের দিকে ভালো করে তাকিয়েছ কখনো? মানুষের শরীর নামের এই অবিশ্বাস্য যন্ত্রের কলকব্জাগুলো কীভাবে কাজ করে কখনো চিন্তা করেছ? এবারের শিখন অভিজ্ঞতায় আমরা এই যন্ত্রটাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখব। দেহঘড়ির কলকব্জা।

দেহঘড়ির কলকব্জা

বিজ্ঞানের কাজই তো হল সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা, বিপুলা মহাবিশ্বের গঠন থেকে শুরু করে ছোট্ট হাতঘড়িটা কীভাবে টিকটিক করে সময় জানায় তা নিয়েও আমাদের প্রশ্নের শেষ নেই। কিন্তু নিজের শরীর নামের যন্ত্রটা কীভাবে কাজ করে তা কি কখনো ভেবেছি? এবার চলো একটু চোখ ফিরিয়ে মানব শরীর নামক এই বিচিত্র যন্ত্রটিকে বোঝার চেষ্টা করা যাক !

প্রথম ও দ্বিতীয় সেশন

প্রথমেই বাইরে থেকে সাদা চোখে তোমার নিজ শরীরের কোন কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখতে পাও সেগুলো একটু মনে করে দেখো। খেয়াল করলে দেখবে, এসব অঙ্গই আমাদের কোনো না কোনো কাজে লাগে; যেমন- চোখ দিয়ে আমরা দেখি, কান দিয়ে আমরা শুনি। এরকমভাবে বাহ্যিক অন্যান্য অঙ্গ আমাদের কী কাজে লাগে সেটা একটু ভালো করে চিন্তা করো। চিন্তা করে যা পেলে তা নিচের ছকে টুকে রাখো-

বাইরে থেকে শরীরের যেসব অঙ্গ দেখতে পাওএগুলো তোমার যা যা কাজে লাগে





দেহঘড়ির কলকব্জা এবার শরীরের ভেতরের কলকব্জার কথায় আসা যাক। যেমন ধরো- আমাদের হাত বা পা তো বাইরে থেকেই দেখা যায়, কিন্তু আমাদের মাথার ভেতরে থাকা যে মহাগুরুত্বপূর্ণ মস্তিষ্ক, সেটা কি আমরা বাইরে থেকে দেখতে পাই? এরকম আমাদের শরীরের আরও অনেক অঙ্গই তো আছে দেহঘড়ির কলকব্জা।

দেহঘড়ির কলকব্জা

যেগুলো আমরা বাইরে থেকে দেখি না, কিন্তু সেগুলো ঠিকঠাক কাজ না করলে আমরা অচল হয়ে পড়ব! আগের মতোই এবার শরীরের ভেতরের যেসব অঙ্গের কথা মনে পড়ে, সেগুলো নিচের ছকে টুকে রাখো। পাশাপাশি এসব অঙ্গ কী কী কাজ করে তাও লিখতে ভুলো না! দেহঘড়ির কলকব্জা।

শরীরের ভেতরে যেসবঅঙ্গ রয়েছেএগুলো তোমার যা যা কাজে লাগে



তোমার পাশের বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে দেখো, ও কোন কোন অঙ্গের কথা লিখেছে। এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কথা কি ও লিখেছে যেটা তোমার বাদ পড়ে গিয়েছিল?

শিক্ষকসহ ক্লাসের বাকিদের সঙ্গেও আলোচনা করো। নিশ্চয়ই সবাই মিলে নানা অঙ্গের কথা লিখেছ, যার সবগুলোই আমাদের শরীরের জরুরি সব কাজ করে। হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, পাকস্থলী, এসকল অঙ্গের কথাই হয়তো আলোচনা হয়ে গেছে।

এবার আমরা একটা মজার খেলা খেলব! প্রথমেই ক্লাসের সবাই ছয়টা দলে ভাগ হয়ে যাও। এবার ছোট ছোট কাগজের টুকরায় এই ছয়টা নাম লিখে ভাঁজ করো- হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, পাকস্থলী, বৃক্ক বা কিডনি, ও হাড় বা কঙ্কাল। এবার লটারি করে প্রতি গ্রুপ একটা টুকরা তুলে নাও। তোমার দলের ভাগ্যে যে অঙ্গ এসেছে সেটাই তোমার দলের নাম। তোমার দলের নাম কী দাঁড়াল দেখো তো! দেহঘড়ির কলকব্জা।

এবার তোমাদের একটা বিতর্ক প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে হবে। বিতর্ক না বলে অভিনয়ও বলতে পারো। কারণ তোমরা প্রত্যেকেই ওই অঙ্গ হিসেবে অভিনয় করে দেখাবে।

প্রত্যেক দলকেই যুক্তি দিয়ে অন্যদের বোঝাতে হবে কেন তারাই শরীরে সবচাইতে জরুরি অঙ্গ বা তন্ত্র! যেমন, মস্তিষ্ক দল যুক্তি দেবে কেন মানুষের শরীরে সে-ই (মানে মস্তিষ্কই) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ! আবার পাকস্থলী গ্রুপ যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করবে যে মানুষের শরীরে পাকস্থলীর চেয়ে জরুরি আর কিছু নেই! দেহঘড়ির কলকব্জা।

তোমার দলের যুক্তিগুলো গুছিয়ে নেওয়ার আগে একটু প্রস্তুতি দরকার না? মানুষের শরীরে অঙ্গগুলো সম্পর্কে ভালোভাবে না জানলে তো বিতর্ক করাই কঠিন হয়ে যাবে! দলের সবাই মিলে সেজন্য তোমাদের বিজ্ঞান অনুসন্ধানী পাঠ বইয়ের ‘মানব শরীর’ (একাদশ অধ্যায়) অধ্যায়টি পড়ে নিতে পারো।

কীভাবে আমাদের দেহে বিভিন্ন অঙ্গ তৈরি হয়, কোনটা কীভাবে কাজ করে এসব আলোচনা ওই অধ্যায়ে পাবে। কিছু বুঝতে সমস্যা হলে দলে আলাপ করো, এছাড়া শিক্ষকের সাহায্যও নিতে পারো। দেহঘড়ির কলকব্জা।

তৃতীয় ও চতুর্থ সেশন

এই সেশনে বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। কাজেই সেশন শুরু হওয়ার আগেই নিজের দলের সকল প্রস্তুতি নিয়ে নাও। তোমাদের দলের যুক্তিগুলো সাজিয়ে নাও, কীভাবে অন্যদের বোঝাবে যে মানুষের সারা শরীরে তোমরাই সবচেয়ে জরুরি অঙ্গ!

* নিচের ছকে তোমাদের দলের নামসহ অন্যান্য তথ্য লিখে রাখো, যাতে পরে যুক্তিগুলো হারিয়ে না

ফেলো।

দলের নাম:
নির্ধারিত অঙ্গের বর্ণনা:
কোন তন্ত্রের অংশ?এই তন্ত্র শরীরে কী
কী কাজ করে:
কেন সবচেয়ে বেশিদরকারি অঙ্গ:

প্রস্তুতি নেওয়া শেষ? এবার বিতর্কের পালা। পাশের পৃষ্ঠায় এই ছয়টা অঙ্গের ছবি দেওয়া আছে, চাইলে কাগজে এঁকে, বা পোস্টার কাগজ ব্যবহার করে তোমাদের দলের একটা ছবি, লোগো, বা চিহ্ন নকশা করতে পারো; যাতে তোমাদের দলকে দেখেই সবাই বুঝে যায় তোমরা কোন অঙ্গ! (এই ছবিগুলো কিন্তু আঁকার সুবিধার জন্য এভাবে দেয়া। সত্যিকারের ফুসফুস বা কিডনির আকার কত বড়, শরীরের কোথায় থাকে— এসমস্ত বিষয় তোমরা উঁচু ক্লাসে আরো বিস্তারিত জানবে।)

বিতর্কে প্রতি দল পাঁচ মিনিট করে সময় পাবে নিজেদের যুক্তি দাঁড় করানোর। অন্য দলের বিতর্ক চলাকালীন তোমাদের কাজ হবে তাদেরকে নম্বর দেওয়া। আবার তোমরা উপস্থাপন করার সময় অন্য দলগুলোও একইভাবে তোমাদের নম্বর দেবে। কেউই কিন্তু নিজের দলকে নম্বর দিতে পারবে না! দেহঘড়ির কলকব্জা।

নম্বর দেবে তিনটি বিষয়কে মাথায় রেখে- উপস্থাপনা, তথ্যের ব্যবহার ও যুক্তি প্রয়োগ। চাইলে এই তিনটি বিষয়ে ১০ নম্বর করে ধরে মোট ৩০ নম্বরের ভেতর প্রতিটি দলকে মূল্যায়ন করতে পারো; এভাবে-

দলের নাম
বিবেচনার দিকমোট নম্বরপ্রাপ্ত নম্বর
উপস্থাপনা১০
তথ্যের ব্যবহার১০
যুক্তি প্ৰয়োগ১০
দলের মোট প্রাপ্ত নম্বর

পঞ্চম ও ষষ্ঠ সেশন

এবার একটা ছোট্ট কুইজ– তোমরা যে ছয়টি অঙ্গের পক্ষ নিয়ে বিতর্ক করলে, সেগুলো সরাসরি ছয়টি তন্ত্রের কাজে অংশ নেয়। কিন্তু এর বাইরেও আরও তিনটি তন্ত্র রয়েছে যেগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করে। অনুসন্ধানী পাঠ বই থেকে নিশ্চয়ই এর মধ্যেই তোমরা সেগুলোর সম্পর্কে জেনে গেছ।

পরের পৃষ্ঠার ছকে ওই তিনটি তন্ত্রের নাম লিখে, এদের কাজ কী তা একদম অল্প কথায়, নিজের ভাষায় দু-তিন লাইনে টুকে রাখো। চাইলে বইটা আবার দেখে নিতে পারো, বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনাও করে নিতে পারো। দেহঘড়ির কলকব্জা।

তন্ত্রের নামকাজ

বিতর্কে নিশ্চয়ই কেউ না কেউ জিতেছ! যারা জিতেছ তাদের বেশ খুশি লাগছে নিশ্চয়ই! আবার অন্যদের হয়তো একটু একটু মনখারাপও হয়েছে! কিন্তু এবার ঠান্ডা মাথায় একটা বিষয় ভেবে দেখো। যদিও বিজয়ী দল যুক্তি দিয়ে জিতে গেছে যে তাদের অঙ্গটাই শরীরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এখন অন্য অঙ্গগুলো যদি শরীরে কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তাহলে কি অবস্থা দাঁড়াবে?

তোমাদের ক্লাসের দলগুলোর মতো শরীরের অঙ্গগুলোর মধ্যে যদি সত্যি সত্যি এমন প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত, আর সবাই সবাইকে প্রতিপক্ষ ভাবত, কী অবস্থা হতো একবার ভেবে দেখো তো! দেহঘড়ির কলকব্জা।

বুঝতেই পারছ, শরীরকে যদি একটা চলমান সিস্টেম হিসেবে ধরে নাও, এর বিভিন্ন অংশের মধ্যে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নয়, বরং সহযোগিতার মাধ্যমেই সিস্টেমটা চালু থাকে।

আমরা এই যে ঘুরি, ফিরি, খাই দাই, নিত্যদিনের কাজ করি, আনন্দ করি— শরীরের কোনো একটা অংশ বিকল হয়ে পড়লেই কিন্তু আনন্দ দূরে থাক, দৈনন্দিন জীবনটাই বড্ড ঝামেলার মনে হয়। কাজেই সুস্থ থাকতে হলে আসলে এই পুরো দেহযন্ত্রেরই যত্ন নিতে হয় যাতে সকল তন্ত্র মিলেমিশে কাজ করতে পারে।

(যেহেতু প্রতিযোগিতার ব্যাপারটাই বেশ হাস্যকর যা বোঝা যাচ্ছে, পুরষ্কারের বালাই তো নেই। বরং বিজয়ী দল এই উপলক্ষ্যে সবাইকে একটা করে চকলেট খাওয়াতে পারে, কী বলো?) দেহঘড়ির কলকব্জা।

শরীরের যত্নের প্রসঙ্গই যেহেতু উঠল, তাহলে নিজেদের শরীরের যত্নের কিছু পরিকল্পনাও করে ফেলা যাক এই বেলা, কী বলো? কীভাবে তা করা যায়, কী করলে শরীর নামের এই অবিশ্বাস্য জটিল যন্ত্রের সবগুলো সিস্টেম ঠিকঠাকমতো কাজ করবে এবং তোমাকে সুস্থ রাখবে তা নিয়ে বন্ধুরা আলোচনা করো। চাইলে অনুসন্ধানী পাঠ বইয়ের সাহায্যও নিতে পারো।

← নিজের যত্নের পরিকল্পনা করার আগে নিজেদের সম্পর্কে আরেকটু জেনে নিলে ভালো, তাই না? তোমরা তো এখন কিশোর কিশোরী, কিছুদিন আগেই ছিলে একেবারে শিশু। দেহঘড়ির কলকব্জা।

এখন এই কৈশোরে আমাদের সকল মানুষের কিছু বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যার ফলে আমরা আস্তে আস্তে বেড়ে উঠি। এগুলো সম্পর্কে ভালোভাবে না জানলে নিজের শরীর ও মনের যত্নে ঘাটতি রয়ে যেতে পারে, আবার অন্যদিকে অনেক ভুল ধারণা বা কুসংস্কার মাথায় ঢুকে যেতে পারে।

তোমরা যে যার বিজ্ঞান অনুসন্ধানী পাঠ বই থেকে মানব শরীর অধ্যায়ের বয়ঃসন্ধি অংশটুকু পড়ে নিজেরা আলোচনা করে নাও, যাতে কোনো ভুল ধারণা মনে বাসা বাঁধতে না পারে। দেহঘড়ির কলকব্জা।

নিশ্চয়ই জেনে গেছ, সুস্থ থাকার জন্য সময়মতো সুষম খাবার, ঘুম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, এগুলো কতটা জরুরি। এখন তোমার কাজ হলো নিজের জন্য একটা ছোট্ট রুটিন করে ফেলা।

খাবার, গোসল, পড়ালেখা, শরীরচর্চা, বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে আড্ডা, গল্পের বই পড়া, ছবি আঁকা বা অন্য যেকোনো শখের কাজ— এ সবকিছুই রুটিনে আসতে পারে। প্রতিদিন হয়তো একেবারে কাঁটায় কাঁটায় সব মেনে চলা কঠিন মনে হতে পারে, কিন্তু চেষ্টা করতে ক্ষতি কী? দেহঘড়ির কলকব্জা।

পরের পৃষ্ঠার ছকে সম্ভাব্য কাজগুলো বসিয়ে একটা সাপ্তাহিক রুটিনের খসড়া দেওয়া হলো (উদাহরণ হিসেবে একদিনের রুটিনের সময়ও বসিয়ে দেওয়া আছে। তুমি তোমার সুবিধামতো সময় ও কাজ ঠিক করে নিও।)। এর বাইরেও তোমার অন্য কাজ রাখতে চাইলে ছকের ফাঁকা জায়গায় বসিয়ে নিতে পারো।

সব কাজ প্রতিদিন করতে হবে তারও কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সপ্তাহের কোন দিন, কখন, কোন কাজটা করবে তা তোমার সুবিধামতো বসিয়ে নাও।

কাজরবিবার (উদাহরণ)রবিবারসোমবারমঙ্গলবারবুধবারবৃহস্পতিশুক্রবারশনিবার
রাতেররাত
খাবার
রাত ০৮:০০টা
ঘুমাতে যাওয়া রাত ০৯:০০টা

এই রুটিন একান্তই তোমার নিজের ব্যবহারের জন্য, কারও কাছে ঘড়ি ধরে জবাবদিহি করার জন্য নয়। কিন্তু সবার সঙ্গে শেয়ার করতে তো সমস্যা নেই, তাই না? তুমি তাই চাইলে তোমার বন্ধুদের সঙ্গে, বা শিক্ষকের সঙ্গে এই রুটিন শেয়ার করতে পারো। রুটিন মেনে চলার পরে তোমার অনুভূতি জানাতে ভুলবে না কিন্তু! দেহঘড়ির কলকব্জা।

পুরো শিখন অভিজ্ঞতা শেষে তোমার দলের সহপাঠীদের কাজ সম্পর্কে তোমার মতামতের জন্য বইয়ের শেষের ছক-৩ পূরণ করো।

আরো পড়ুন : রান্নাঘরেই ল্যাবরেটরি!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: এই কনটেন্ট কপি করা যাবেনা! অন্য কোনো উপায়ে কপি করা থেকে বিরত থাকুন!!!